ছিনতাই-ডাকাতি করে অর্থ সংগ্রহ করছে জেএমবি

13

ছিনতাই-ডাকাতি করে সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। লুট করা অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে জঙ্গিদের মামলার খরচ, কারাগারে থাকা জঙ্গি পরিবারগুলোর আর্থিক সহায়তা ও জেএমবির সাংগঠনিক নানা কাজে। এভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষ খুনেও জড়াচ্ছে জঙ্গিরা।
সাম্প্রতিক সময়ে ধরা পড়া জেএমবির পাঁচ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ এসব তথ্য পেয়েছে। যাঁদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আলী আশরাফ ভূঞা প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৭ সালের পর অনেকটা ঘাপটি মেরে ছিল জেএমবি। তারা গোপনে আবার সংগঠিত হচ্ছে। সংগঠনের জন্য অর্থ জোগাতে ছিনতাই-ডাকাতি করছে।
পুলিশ বলছে, গত ২৯ ডিসেম্বর বগুড়ায় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার আসামি আবু সাঈদ ওরফে শ্যামল শেখকে (৩৩)। পরে তাঁর কাছ তথ্য পেয়ে জেএমবির আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া ও রাজশাহী পুলিশ। এর মধ্যে গত ১৯ মার্চ রফিকুল ইসলাম ওরফে রাকিব, আবু বকর ওরফে সীমান্ত, তাঁদের একজন সহযোগীকে বগুড়া পুলিশ আটক করে। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে পুরোনো একটি ছিনতাইয়ের মামলায় রাজশাহী পুলিশ গ্রেপ্তার করে শফিকুর রহমান ওরফে উজ্জ্বল মাস্টারকে। তিনি রাজশাহীর ডাকরা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক। এর আগে গ্রেপ্তার থাকা আরেক জঙ্গি রাজশাহীর পুঠিয়ার বাবর শেখের নামও আসে ছিনতাইয়ের ঘটনায়। তাঁকেও পরে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য পায় পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাকিব, আবু বকর ও তাঁদের এক সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বগুড়া পুলিশ জানতে পারে যে রাজশাহীর দুটি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জেএমবি জড়িত। তহবিল সংগ্রহের জন্য তারা ডাকাতি-ছিনতাইয়ে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রহমান জুট স্পিনার্স মিলের সাড়ে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে গত বছরের ৫ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। জুট মিলের দুই কর্মকর্তা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে গাড়িতে করে যাওয়ার পথে দুটি মোটরসাইকেলে করে ছয়জন পথরোধ করে নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দেন। তাঁরা টাকাভর্তি ব্যাগ কেড়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় মতিহার থানায় মামলা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিরা পুলিশকে জানান, দুই দফায় ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয় দফায় এই ছিনতাই করতে সক্ষম হন তাঁরা। জেএমবির রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা শহীদুল্লাহ ওরফে ইয়ামিনের নির্দেশে এই ছিনতাই করেন তাঁরা। এতে নেতৃত্ব দেন জোবায়ের ওরফে বুলবুল। এই ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন দরজি মিজান, ডাক্তার মিজান, মাসুদ রানা, সামিদ, শাহিন, সৈকত, ইব্রাহিম ওরফে আবির, বাবর শেখসহ আরও কয়েকজন।
এর মধ্যে ডাক্তার মিজান ও আবিরের দায়িত্ব ছিল ব্যাংকে অবস্থান করে টাকা নিয়ে বের হওয়ার তথ্য দেওয়া। পুলিশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল ছামিদ ও বাবর শেখের। ডিবি পুলিশ লেখা জ্যাকেট সংগ্রহ করেছিলেন দরজি মিজান। দুটি মোটরসাইকেলে চেপে ছিনতাইয়ে সরাসরি অংশ নেন ছয় জঙ্গি। এর মধ্যে সোহাগ ও মাসুদ রানার হাতে ছিল দুটি পিস্তল। ছিনতাইয়ের পর তাঁরা উজ্জ্বল মাস্টারের বাড়িতে বসে টাকা বিলিবণ্টন করেন। এর মধ্যে সংগঠনের কাজে ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা আবিরের মাধ্যমে জেএমবি নেতা তৌকিরের কাছে পাঠানো হয়। অবশিষ্ট টাকা পরে কারাগারে থাকা জঙ্গি পরিবারকে সহায়তাসহ সাংগঠনিক কাজে ব্যয় করা হয়।
এঁদের মধ্যে বাবর শেখ ও উজ্জ্বল মাস্টার যথাক্রমে গত ২৮ ও ৩০ মার্চ আদালতে জবানবন্দি দিয়ে এই ছিনতাই ও টাকা বিলির বিবরণ দেন বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান।

বিকাশ কর্মী হত্যা, ছিনতাই
২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বেলপুকুর এলাকায় বিকাশ কর্মী রবিউল ইসলাম ও মমিনুল ইসলামকে গুলি করে টাকা ছিনতাই করেন মোটরসাইকেলে আসা তিন ছিনতাইকারী। ছিনতাইকারীর গুলিতে নিহত হন রবিউল। দেড় বছর আগের ওই ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তথ্য দেন সম্প্রতি বগুড়া পুলিশের কাছে ধরা পড়া রাকিব, আবু বকর ও তাঁদের এক সহযোগী (যাঁর নাম পুলিশ এখন প্রকাশ করতে চাইছে না)।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এই জঙ্গিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানান যে সংগঠনের তহবিল জোগাতে বিকাশ কর্মীর কাছ থেকে টাকা ছিনতাই করেন। ছিনতাইয়ের সময় টাকা দিতে না চাওয়ায় বিকাশ কর্মীকে গুলি করেন তাঁরা।
জঙ্গিদের দেওয়া তথ্যমতে, সংগঠনের ব্যয়ভার মেটানো, কারাগারে থাকা জেএমবির সদস্যদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, মামলা পরিচালনার খরচ মেটানোসহ সংগঠন পরিচালনা, দাওয়াতি কার্যক্রমের নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। ছিনতাই-ডাকাতি করে এই অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
অবশ্য অর্থ সংগ্রহের জন্য জেএমবির সদস্যদের ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে জড়িত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ২০০৩-২০০৪ ও ২০০৫ সালেও জেএমবি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন এনজিওতে ডাকাতি করে তহবিল সংগ্রহ করেছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জেএমবি ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার খবর বের হয়।
২০০৭ সালের ২৯ মার্চ জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানসহ শীর্ষস্থানীয় পাঁচ জঙ্গির ফাঁসি হয়। এরপর কয়েক বছর জেএমবি চুপচাপ ছিল।
২০১৪ সাল থেকে জেএমবির জঙ্গিরা আবার ডাকাতিতে জড়িত হওয়ার খবর বের হয়। ওই বছর রংপুরের কাউনিয়ায় বিকাশের দোকানে ৬ লাখ টাকা লুট, বগুড়ার সাবগ্রামে একটি বাড়ি থেকে ৮ লাখ টাকার মালামাল লুট, গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় ৩৫ লাখ টাকা, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গিতে ২৮ লাখ টাকা ছিনতাই করেন জেএমবির জঙ্গিরা, যা পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে।
২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর দিনাজপুরে তৃপ্তি ফিলিং স্টেশনে ডাকাতি করতে গিয়ে তিনটি পিস্তলসহ ধরা পড়েন জেএমবির চার সদস্য। তখন গণপিটুনিতে নিহত হন সাব্বির নামে এক জেএমবির সদস্য। তখন আটক চারজনই আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, জেএমবির সাংগঠনিক ব্যয় মেটানো এবং কারাগারে আটক জঙ্গিদের পরিবারকে অর্থ সহায়তার জন্য তাঁরা ফিলিং স্টেশনে ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সিগারেট বিক্রির ৪ লাখ টাকা লুট করে জেএমবি। ওই বছর গাইবান্ধা সদরে যাত্রা প্যান্ডেলে টাকা ওঠাতে গেলে জেএমবির সদস্যরা এক পুলিশ সদস্যের মোটরসাইকেল ছিনতাই করেন। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীতে স্বর্ণের দোকান লুট করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়েন জেএমবি সদস্য ফজলুল হক ওরফে অনীল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো জেএমবি আর্থিক সংকটে পড়ে নতুন করে ডাকাতি-ছিনতাইয়ে যুক্ত হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তারা এমন কয়েকটি ঘটনায় জড়িত ছিল, যা পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ২১ এপ্রিল রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি করেন জঙ্গিরা। পালানোর সময় তাঁদের ছুরিকাঘাত ও গুলিতে ব্যাংকের কর্মচারীসহ আটজন নিহত হন। লুট করে নিয়ে যান ৬ লাখ ৮৭ হাজার ১৯৩ টাকা। ওই ডাকাতির পরের বছর জেএমবির জঙ্গিসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুজনকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত।