অনেক কিছু বলতে চেয়েও ওরা চুপ হয়ে গেছে : মাহবুবা স্মৃতি

188

আপু আপনাদের কতো সুবিধা.. চাইলেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে যেতে পারছেন, আর আমরা!ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পলিটিকাল বড় ভাইদের ভয়ে যেতে পারছি না।”এক ছোট ভাইয়ের পাঠানো মেসেজটার দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম..কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না !!
সত্যিই তো, আমরা (মেয়েরা) হলে থাকা সত্ত্বেও নির্ভয়ে নিজের ইচ্ছা মতোন আন্দোলনে যেতে পারছি,তাহলে ওরাও কেন হলে থেকে যেতে পারছেনা?আমি আমার নিজের হলেও দেখেছি,গতকাল যেসব মেয়ে(পলিটিক্যালি হলে থাকছে) আন্দোলনে গিয়েছিল, আজ প্রচুর শিক্ষার্থী রোকেয়া হল থেকে রাজু ভাস্কর্যের সামনে গেলেও ঐ মেয়েগুলো যায়নি,কিছু কিছু মেয়ে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল,অনেক কিছু বলতে চেয়েও ওরা চুপ হয়ে গেছে!দেখলে খুব কষ্ট হয়!এতোটা অসহায়!নিশ্চয় ওদের হাত-পা বাঁধা!হয়তো রুমে বসে লিডারদের বকাঝকা খেয়ে, ভয় পেয়ে চুপটি করে রুমের এক কোণে বসে ছিল তারা!!হয়তো যেতে না পারার আফসোস করতে করতে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল!হয়তো আফসোস করছিল,”আমার বাপের পয়সা থাকলে আমি পলিটিক্যালি হলে না উঠে সাবলেট কিংবা বাসা নিয়ে থাকতে পারতাম,ইচ্ছামতোন আন্দোলনেও যেতে পারতাম।”হয়তো কিছু ছেলে বসে থেকে ভাবছিল,”ছেলেদের হলগুলা সব পলিটিকাল কেন?মেয়েদের মতো ১ম বর্ষেই লিগাল সিট পাওয়ার কেন কোনো সিস্টেম নেই?”ওরা হয়তো ভাবছিল,”আন্দোলনে যাওয়ার অপরাধে যদি আমাকে হল থেকে বের করে দেয়,আমি যাবো কোথায়?থাকবোই বা কোথায়?আমার বাপ তো আর বড়লোক না, কিংবা ঢাকায় থাকার মতো আত্মীয়স্বজনও নেই…”ইত্যাদি!ওদের না বলা চিৎকার কয়জন শুনতে পায়?কারণ ‘কিছু চিৎকার যেমন বাইরে থেকে গর্জন করে,তেমনি কিছু চিৎকার ভিতর থেকেও হু হু করে,সবাই সেটা শুনতে পায়না।সবার সে ক্ষমতাও নেই।তারজন্য অতি দরদি আর মহামানব/মহামানবীর কোমল হৃদয়ের দরকার!’
আমি জানিনা,আমার এই পোস্ট সেইসব লিডার ভাই-আপুদের চোখে পরবে কিনা,যারা ভয় দেখিয়ে/চড় থাপ্পড় মেরে ছেলেমেয়েদের আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেছেন!আমি জানিনা,আমার এই পোস্ট ঐসব ভাই-আপুদের কাছে পৌছাবে কিনা,যাঁরা নিজেদের গণ্ডি ঠিক রাখতে ছেলেমেয়েদের উপর জোরপূর্বক ক্ষমতা চাপাচ্ছেন!
হাসি আসে!খুউব হাসি আসে।আচ্ছা,আপনারা না হয় দল করে খুব বড় পোস্টে আছেন,সুযোগসুবিধাও পাচ্ছেন,ওরা কি পাচ্ছে তবে?ওদের পরিবারে গিয়ে ১বার খোঁজ নিয়ে দেখেছেন?ওদের পরিবারে কে কি করে?না করেননি,কারণ না করলেও চলবে।আপনাদের কেবল ওদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারলেই হবে।ব্যস!আর কিছুনা।আপনাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত, কিন্তু ওদের কি ভবিষ্যৎ হবে?একবার ভেবে দেখেছেন!তা দেখবেন কেন?অন্যের সুবিধা- অসুবিধা দেখার সময় নেই আপনাদের।তাইতো একটা ন্যায্য অধিকার আদায়ে ওদের যাওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আপনাদের ভয়ে যেতে পারছেনা!আপনারা নিজেদের জন্য সুযোগ সুবিধা ঠিক করে নিয়েছেন,এবার ওদের দিকে তাকাননা একটু..ওরাও তো আপনার ই কোনো ছোট ভাই কিংবা বোনের মতো,তাই না?ওরা ও তো কোনো পরিবার থেকেই এসেছে।হয়তো,বড় লোক বাপের সন্তান নয়,কিন্তু প্রতিদিন যুদ্ধে করে জীবন সংগ্রামে টিকে আছে,এমনি কোনো খেটে খাওয়া বাবার সন্তান সে।সেই ছেলেটার উপর হয়তো আর কিছুদিন পরই চাপ আসবে,”বাবা,তুই এট্টা চাকরি করলে তোর বাপে ওট্টু শান্তি পাইবো।” বাবারে, আমি আর কতো খাটমু ক? এইবার তুই কিছু একটা কর.. শরীলডা আর আগের মতো নাইরে”…এই রকম হাজারো আকুতি ঝরে পড়বে(অনেকের তো প্রতিদিন শুনতে হয়)…কে জানে?ভবিষ্যতে আপনার ছেলে /মেয়েটিও চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে পারে!
তাহলে কেন আপনারা চোখে রঙিন চশমা লাগিয়ে বসে আছেন?কোনো ভুল আন্দোলন তো হচ্ছেনা!ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো সরকার বিরোধী আন্দোলনেও নামেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা রয়েছে আমাদের। আমরা কোনো কোটার বিরোধিতা ও করছি না। শুধু কোটার সংস্কার চাচ্ছি! ৫৬% কোটা কি যুক্তিসংগত? নিশ্চয় না, কোনো স্বাভাবিক আর বিবেকবান মানুষদের পক্ষে কখনোই এটা মেনে নেয়া সম্ভব নয়।তাহলে আপনারাই বলুন প্লিজ,কেন ওদের বাধা দিচ্ছেন?…ওহ!আপনারা তো আবার…থাক, ঐটুকু না বলি।
অনুরোধ করছি, এভাবে জোর করে ওদের আটকে না রেখে ওদের যেতে দিন।ওদের ইচ্ছার কি কোনো দাম নেই!মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বলেও তো কথা আছে,তাইনা?আমি বিশ্বাস করি,আপনাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্য দলের চেয়ে অনেক বেশি উদার।দয়াকরে এই বিশ্বাসটুকু হারাতে দিবেন না প্লিজ!

মাহবুবা স্মৃতি
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।