আমার জীবনের কিছু কথা : সেঁজুতি রহমান

22

আমার জীবনের প্রথম ভুলটা করেছিলাম কিশোরী বয়সে। তখন বয়স ১৪ হবে।

একজন ভুল মানুষের প্রেমে পড়েছিলাম। তারপর থেকেই কেবল ভুল আর ভুল। মনে মনে ভাবি আর বোধহয় ভুল হবেনা, তবুও মনের অজান্তেই আবার কিছু ভুল করে বসি।

কিশোরী বয়সে এক যুবক আমার প্রেমে পড়ে গেলো, শুরুতে আমি পাত্তা না দিলেও তার আচার আচরনে তার প্রতি দুর্বল হতে বাধ্য হই আমি এক সময়।
একদিন রাতে পড়ার টেবিলে বসে বই পড়ছি, সামনে পরিক্ষা টেনশনও হচ্ছে। হঠাৎ করে আমার রুমে ঢুকলেন ছবি আপা। আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন। সেই ছবি আপা আমার একজন খুব পছন্দের একজন মানুষ ছিলেন। তিনি দেখতে ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী একটা মেয়ে, হয়ত তাকে ভালো লাগার এটাও একটা কারন।
ছবি আপা এসে আমার পড়ার টেবিলের পাশে এসে দাড়ালেন। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে আমাকে ভাঁজ করা একটা কাগজ দিলেন, তারপর চলে গেলেন। আমি কিছু না বুঝেই কাগজটা খুললাম। সেটা খুলেই আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। পুরো কাগজটা রক্তে মাখামাখি।
সারারাত ঘুমাতে পারলাম না, পড়াশুনায় তো আর মন বসেনা। পরদিন হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে সেই যুবক ঘুরে বেড়ায় আমার সামনে দিয়ে। এ গল্পের শুরুটা ছিলো ওখান থেকেই……….

তারপরও মাঝে মাঝে চিঠি আসতো, এটা সেটা কত কথা তার অনুভুতি গুলো জানাত, কিন্তু সে কখনও আমার মুখোমুখি দাঁড়াত না। রাস্তায় কখনও দেখা হলে মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যেতো। আমি বিষয়গুলো খুব একটা পাত্তা দিতামনা। আবার ভালোও লাগতো, একজন আমাকে ইনিয়ে বিনিয়ে চিঠি লিখছে আর সেগুলো পড়তে আমার বেশ ভালোই লাগতো।
আমিও তার দু একটা চিঠির উঃ দিতাম, তবে খুব ছোট করে লিখতাম। সত্যি বলতে কি আমি তার পাগলামি গুলোকে ভয় পেতাম খুব।

একদিন একটা চিঠিতে সে লিখলো আমি তাকে বিয়ে না করলে সে আত্যহত্যা করবে। ভাবলাম এটা ঠিক আমাকে ভয় দেখানোর জন্য করছে। তাই সে কথাকে আমি পাত্তা দিলাম না, আর চিঠির উঃ দিলাম না।
দুদিন পর শুনতে পেলাম অনেক গুলো ঘুমের ঔষধ খেয়ে সে দুদিন ধরে ঘুমিয়ে আছেন, তার বাড়ির লোক ডাঃ ডাকলেন আর সে যাত্রায় রক্ষা হলো। সবাই তো অবাক, এমন কাজ কেনো করলো ছেলেটা ?
আমি শোনার পর তো ভয়েই অস্হির, কারন টা তো কেবল আমি একাই জানি। এক সময় প্রতিবেশীরা অনেকেই জেনে গেলো বিষয়টা। আমার পরিবারের লোকজন জানার পর তো আমাকে কড়া শাসন করা হলো।
তারপর ৯ মাস চুপচাপ। তার সাথে আমার আর কোন যোগাযোগ রইলোনা।

একদিন আমার মায়ের একটা নতুন শাড়ি পড়েছি শখ করে, হাঁটছি ঘুরছি—
সে ঐ দিন আমাকে আবার দেখে ফেলে, এবং পাশের বাসার এক মেয়েকে দিয়ে আমাকে সে খবর পাঠায় যে আমি যদি আজ সন্ধ্যায় তার সাথে দেখা না করি, তাহলে সে আবারও আত্যহত্যা করবে। ভয়ে তো আমার কাপুনি ধরে গেলো। আমি জানতাম এটা সে করতে পারে, কারন আগেও একবার এমন টা সে করেছে। ভাবতে শুরু করলাম কি করবো, অনেক ভেবে মনে হলো একবার দেখা করে দেখি কি বলে সে।

তখন অনুমান সন্ধ্যা ৭ টা বাজে। কারেন্ট চলে গেছে, মনে হলো এই সঠিক সময়। আমি গুটি গুটি পায়ে ঘর থেকে বের হলাম। আমার সাথে সেই মেয়েটিও ছিলো, যাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলো।
আমাদের বাসার ৩ টা বাসা পরেই এক বাসায় তার থাকার কথা। দুজন মিলে গেলাম।
আমি ঘরে ঢুকলাম, আর মেয়েটি দরজার বাইরে দাড়িয়ে পাহারা দিতে লাগলো।
আমি ঘরে ঢুকতেই সে আমার কাছে জানতে চাইলো, আমি কেমন আছি, কেনো তার সাথে যোগাযোগ করিনা ইত্যাদি………
বড় জোর ৩ মিনিট হয়েছে আমি তার সাথে কথা বলছি। এর মধ্যেই বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে আমার নাম ধরে ডাকা হচ্ছে। এবং আমাকে খোঁজা খুঁজি শুরু হয়ে গেছে।
মেয়েটি দৌড়ে এসে বললো আমাকে সবাই খুঁজছে। আমি তো ভয়েই তখন অস্হির, এখন কি হবে ? আমাকে এ ঘর থেকে যদি কেউ বের হতে দেখে তাহলে তো আমার বদনাম হবে। কি করবো আমি? ভয়ে কেঁদে ফেললাম। আর ওকে বললাম তোমার জন্য এখন আমাকে এই ফল ভোগ করতে হবে। সেও ভাবতে পারেনি এমনটা হবে।
বাইরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে আমরা ঘরের ভেতর।
কেউ জানেনা, আবার বের হতেও পারছিনা।

আমাকে ও বললো কান্না থামাও, আমি একটা ব্যাবস্হা করছি। ঐ মেয়েটিকে বললো, তুমি বাইরে গিয়ে দেখো ওদের ওখান থেকে সরাতে পারো কি না। মেয়েটি ছিলো আমার সমবয়সি, তবে অনেক চালাক। সে আস্তে আস্তে বাইরে বের হলো, তার পর সবার মাঝে গিয়ে বললো যে সেঁজুতি কে দেখলাম ঐ দিকে যেতে। সবাই সেই দিকে আমাকে খুঁজতে চলে গেলো।

আর এই সুজোগে ও আমার হাত ধরে বাসার পাশ দিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে চলতে শুরু করলো। কিছু দুর গিয়ে আমাকে বললো এখন যদি তুমি বাসায় ফিরে যাও সবাই তোমাকে প্রশ্ন করবে, তুমি এতক্ষন কোথায় ছিলে ? আর তোমার বদনাম ও হবে। আর কাউকে মুখ দেখাতে পারবেনা। তাই তুমি আমার সাথে চলো…..

আমি তখন কিছুই ভাবতে পারছিলাম না, ভাবার মতো সময় বা সুজোগ কোনটাই তখন ছিলোনা।
চললাম তার হাত ধরে অজানার পথে।
তখন আমার বয়স ১৬ বছর চলছিলো। আইনের চোখে আমি ছিলাম নাবালিকা।
তবুও আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো। কারন ওদের পরিবারের সবাই আমাকে খুব পছন্দ করতেন।

কিন্তু ঝামেলা করলেন আমার পরিবারের লোকজন। এ বিয়ে তারা মানবেনা। তাদের মেয়ে নাবালিকা তাই এ বিয়ের কোন মূল্য নাই তাদের কাছে। তারা আমার স্বামির নামে মামলা করলেন।
৩ টা মামলা হলো তার ও তার পরিবারের মানুষদের নামে।
৩ মাস আমি ও আমার স্বামি পালিয়ে রইলাম।
কিন্তু ঝামেলা হলো আমার শ্বশুর কে নিয়ে, তিনি সরকারী চাকরী করতেন বলে তার পক্ষে পালানো সম্ভব নয়। অবশেষে আমরা দুজন নিজেই কোর্টে এসে হাজির হলাম।
আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হবে, কোর্ট থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।
আমি জর্জ সাহেবকে বললাম, আমি আমার স্বামি ছাড়া এক পা ও কোথাও যাবোনা।
তখন কোর্ট থেকে আমাকেও সেভকাষ্টুরীতে রাখার অনুমুতি দেওয়া হলো।

শুরু হলো আমাদের দুজনের জেলখানার জীবন।
আমার নামে কোন মামলা নেই, আমি ছিলাম ইচ্ছাকৃত। কারন আমি যদি তখন আমার পরিবারের সাথে চলে যেতাম, তাহলে আমার স্বামির নামের ৩ টা মামলায় তার ১৪ বছর সাজা হয়ে যাবে। তাই, যার হাত ধরে পালালাম, যাকে বিয়ে করে ৩ মাস সংসার করলাম, তাকে তো একা আমি বিপদে ফেলে চলে যেতে পারবোনা।
পারিনি তাকে ফেলে চলে যেতে।
এর মাঝে কদিন পর পর আমার পরিবারের লোকজন আসতো আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি যাইনি তাদের সাথে……..

এভাবে জেলে আমাকে ও আমার স্বামিকে থাকতে হলো পুরো ২৩ মাস।
তারপর আমার ১৮ বছর পূর্ন হলো, আমিও সাবালিকা হলাম, এবং জেল জীবনের সমাপ্ত হলো।

শুরু করলাম নতুন করে সংসার জীবন।
২ বছর মামলা চালাতে গিয়ে আমার শ্বশুরের কেবল বাড়িটা ছাড়া সবই বিক্রি করতে হয়েছিলো।
আমার স্বামি তখন ছিলেন বেকার। সংসার চালানোর জন্য তাকে একটা দোকানে মাত্র ৮০০ টাকা বেতনের চাকরি নিতে হলো। আমাকে একটা শাড়ি কিনে দেওয়ার সামর্থ তার ছিলোনা। দিনের পর দিন অনেক কষ্ট করেছি। তবুও আমি হার মানিনি জীবন যুদ্ধে।

আমি আশে পাশের ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াতাম। আর আমার প্রতিবেশী বউ মেয়েদের শেলাই শেখাতাম।
হাতে সূচ সুতো দিয়ে শেলাই করাটা ছিলো আমার ছোট বেলা হবি। আমি খুব পছন্দ করতাম সূচ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করতে। উলের কাজ, কুশি কাটার শেলাই মেশিনের কাজ, সব ছিলো আমার জানা।
সেই বিদ্যাটাই কাজে লাগলো তখন। বিভিন্ন অর্ডারী কাজ গুলো নিজে করতাম, ও মেয়েদের দিয়ে করাতাম। রাতদিন এক করে কাজ করেছি।
আমার বাবার বাড়ির কারো সাথেই আমার কোন যোগাযোগ ছিলোনা ৫ বছর। তবুও এত অভাব অনটনের মাঝেও আমার ঘরে সুখ ছিলো কানায় কানায় পরিপূর্ন।

এক সময় ৫ বছর পর আবার আমার বাবার বাড়ির সাথে আমার সম্পর্ক ভালো হলো। কিছু আত্মীয়দের সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো। তাদের কারনেই আমার পরিবারের সাথে আবার আমার পূর্ন মিলন ঘটলো, আমার ছেলের জন্মের পর।
আমি আমার বাবার বাড়ির মানুষের কাছে নত হয়ে আমার স্বামিকে টাকা এনে দিলাম ব্যবসা করার জন্য………..
আর ওটাই আমার জীবনের কাল হলো।

ও ব্যবসা শুরু করলো।
উন্নতি করতে খুব সময় লাগেনি তার, খুব তারাতারিই তার সবই বদলে গেলো। বদলে গেলো তার লাইফ ষ্টাইলও……..

এখন সে রাত দুপুরে মাতাল হয়ে টলতে টলতে বাড়ি ফেরেন, কখনও বা ফেরেননা।
এখন সে এক নারীতে সন্তষ্ট নয়, তার বিভিন্ন নারী প্রয়জন হয়। তার মেজাজ মর্জির কাছে যাওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। এখন সে কারো ধার ধারেনা।
রাতের পর রাত, দিনের পর দিন একই বিছানায় শুয়ে থেকেও কেউ কারো সাথে কথা হয়না……..
প্রয়জনের বাইরে কারো সাথে কারো কথা হয়না।

হা হা হা……..এই হলো আমার প্রেমিক স্বামি।
যে আমার জন্য হাত কেটে রক্ত দিয়ে চিঠি লিখতো, ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্যহত্যা করার চেষ্টা করেছিলো, যে আমার হাত ধরে অন্ধকার রাতে পালিয়েছিলো, যাকে বাঁচানোর জন্য আমি ২ বছর জেলে থাকলাম, দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে ছেড়া শাড়ী পড়েও দিন কাটিয়েছি………

এই হলো ভালোবাসার গল্প………..আমার জীবনে কিশোরী বয়সের ভুলের সাস্তি।

এটুকু হলো আমার জীবনের প্রথম অধ্যায়।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের গল্প আরও কঠিন বাস্তবতা।
যদি আবার কখনও বলতে ইচ্ছে করে, তবে সেদিন দ্বিতীয় অধ্যায়টা বলবো।
আজও আমার ইচ্ছে ছিলোনা আমার জীবনের এই গল্প কাউকে শোনাই……………..
কিন্তু ভালবাসা নিয়ে যারা বড় বড় কথা বলেন,
লম্বা লম্বা বক্তিতা দেন, তাদের কে বলছি—

ওহে—হ্যালো–আপনাকেই বলছি…………
মোটা মোটা বই পড়ে ভালোবাসা শেখা যায়না।
ভালোবাসা শিখতে হয় জীবন থেকে। সোনার কাটা চামচ দিয়ে খাবার খেলে কি করে বুঝবেন, গরিবেরা ভালোবাসার জন্য কতটা সেক্রিফাইস করতে পারে ? একটা নারী ভালোবাসার জন্য কি কি করতে পারে ? একজন নারী ভালোবাসার মানুষের জন্য কতটা বালিশ ভেজাতে পারে ?