খোকা বলে ডাকতো যে সে আমার মা : রফিকুল ইসলাম মন্ডল বুলবুল

149

খোকা বলে ডাকতো যে সে আমার মা
এখন কেউ ডাকে না- খোকা শুনে যা।
মায়ের কাছে বায়না যত মায়ের কাছেই খুনসুটি
মায়ের কাছে খোকা তার ছিটকে পড়া চন্দ্রটি।
সেই মা এখন হারিয়ে গেছে আর পাবো না তারে
এখন কেউ ডাকে না, খোকা অফিস যাবি নারে?

আন্তর্জাতিক মা দিবস- আমার আজকের এই লেখাটি মাকে কেন্দ্র করে। যদিও মাকে নিয়ে লেখার মত যোগ্য সন্তান হতে পারি নাই তারপরেও সন্তান হিসেবে যেটুকু না লিখলেই না তারই অবতারণা। সারাবিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে বিশ্ব মা দিবস। বিশ্বজুড়ে এই ‘মা দিবস’ উদযাপন, এটি আসে মূলত আমেরিকানদের হাত ধরে। ১৮৭০ সালে সমাজসেবী জুলিয়া ওয়ার্ড হো আমেরিকার নারীদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান। সে সঙ্গে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেওয়াার জন্য প্রচুর লেখালেখি করেন। ১৯০৫ সালে আনা জারভিস মারা গেলে তার মেয়ে আনা মারিয়া রিভস জারভিস মায়ের কাজকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সচেষ্ট হন। ওই বছর তিনি তার সান ডে স্কুলে প্রথম এ দিনটি মাতৃ-দিবস হিসেবে পালন করেন। ১৯০৭ সালের এক রোববার আনা মারিয়া স্কুলের বক্তব্যে মায়ের জন্য একটি দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। ১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এভাবেই শুরু হয় মা দিবসের যাত্রা। এরপর পৃথিবীর দেশে দেশে মা দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকার পাশাপাশি মা দিবস এখন বাংলাদেশসহ অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, রাশিয়া ও জার্মানসহ শতাধিক দেশে মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ সারাবিশ্বের প্রায় ৬০টির মতো দেশে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার একসঙ্গে মা দিবস পালিত হয়ে আসছে বহু যুগ ধরেই।

আজকে মা দিবস তাই পুরো নিউজফিড জুরে মাকে নিয়ে কতো ভালবাসা দেখছি। সত্যি যদি আআমরা আমাদের মাকে এতো ভালবাসতাম তাহলে আমাদের দেশে এতো এতো বিদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন পড়ত না। আমাদের মাকে কেন বিদ্ধাশ্রমে যেতে হবে?

মা বাবা সন্তানের জন্য এমন একটা আশীর্বাদ যা খুব কম সময়েই আমাদের সৃষ্টিগোচর হয়। একজন মা যে কতটা ভালবাসা মিশিয়ে সন্তানের মুখে ভাত তুলে দেয়, সেটা উপলব্ধি করার মত জ্ঞান যদি সন্তানকে সাথে সাথে বিধাতা দিয়ে দিত, তবে কোন বিদ্ধাশ্রম নামক স্থানের অস্তিত্ব থাকত না।

গতকাল ঢাকার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম, জানালার পাশ দিয়ে দেখলাম এক বাবা বাসে বসে ছিলেন। যায়গা সংকট হোক কিংবা ভাড়া, উনি প্রায় ৮-৯ বছরের একটা ছেলেকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন। পোশাক-পরিচ্ছেদে লোকটাকে দিন-মজুর হিসেবেই পরিচয় করায়। মুগ্ধ হলাম সন্তানের প্রতি অকৃত্তিম ভালবাসা দেখে, ছেলেটা কোলে ঘুমিয়ে ছিল, লোকটি তার বাম হাতে থাকা কাপরের শপিং ব্যাগ জানালার সাথে ঠেকিয়ে ছেলেটার মাথা রেখেছে ব্যাগের উপর। গাড়ির ঝাকুনিতে যেন ঘুম না ভাঙ্গে অথবা আঘাত না পায় এর জন্য বাবার আপ্রাণ চেষ্টা। মোড় ঘুরতে ঘুরতেই রোদের আলো পড়ল ছেলেটার মুখমন্ডলে, আমার চোখ এড়ালেও সেই বাবার চোখ এড়ায়নি, উনি ডান হাত ছেলেটার মুখের উপরে ধরেছেন। অজান্তেই চোখের জল বেড়িয়ে গেল। একপাশের জল আনন্দের ছিল। এত দারুণ একটা ভালবাসার চিত্র খুব কম মানুষই দেখতে পায়, সৌভাগ্যবসত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হল। যা হার মানিয়ে দিল নামিদামি সকল সিনেমার দৃশ্যপট।

এরকম আমারও একটা গল্প আছে, তখন খুব ছোট আমি, বাসের সেই ছেলেটির বয়সি হব, এক রাতে আমি আর মা বারান্দায় ঘুমিয়েছিলাম। মাঝ রাতে তুমুল বৃষ্টিতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, ঘুমের তন্দ্রা কেটে যেতেই আবিস্কার করি বিছানার একপাশ পুরোপুরি ভিজে গেছে, মা আমাকে বিছানার শুকনো অংশে রেখে বিছানা একপাশে গুছিয়ে নিজে গুটিশুটি হয়ে বসে
এর পর কেটেছে বহু বছর, সময়ের সাথে সাথে বড়ও হয়েছি অনেক। কিন্তু সেই ঘটনার জন্য মাকে ধন্যবাদ দেয়া হয়নি। দেয়া হয়নি এরকম শতকোটি নিঃস্বার্থ ভালবাসার প্রতিদান। পছন্দের মানুষটির মত মা-বাবাকে খুব কম মানুষই বলতে পারে ভালবাসি, হয়তো কেউ বড় হওয়ার পর কোনদিন বলেই’নি। অথচ এই মানুষগুলোর ভালবাসায় বিন্দুমাত্র খাত নেই।

মা জাতি সম্মানি জাতি। মায়ের তুলনা একমাত্র মা। মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই। মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রতি মুহূর্তের। সারাবছর মায়ের হক আদায়ে বেখবর, আর ৮ মে, ‘মা দিবস’ এলেই মায়ের প্রতি আবেগের ভালবাসা ঢেলে দেয়া অযৌক্তিক? বছরে একবার ঢোলঢাল পিঠিয়ে ভালবাসা প্রকাশ এটা নৈতিক ভাবে সমর্থন করি না। মাকে ভালবাসতে হবে সমসময়ই। মাকে যথাযথ সম্মান ও ভালবাসার কথা স্বয়ং কুরআনুল কারীমে আল্লাহপাক নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহপাক বলেন, ‘তোমরা কেবলমাত্র তারই ইবাদত করবে এবং পিতা মাতার সাথে সদ্বব্যবহার করবে। যদি তাদের মধ্যে একজন কিংবা দুজনই তোমার নিকটে বৃদ্ধ বয়সে উপনিত হয়ে যান তখন তাদেরকে ‘উফ’ শব্দও বলবে না এবং তাদেরকে ধমও দিবে না। আর তাদের জন্য দয়ার মধ্য থেকে নম্রতার বাহু ঝুঁকিয়ে দাও। আর তাদের জন্য দোয়াস্বরপ একথা বলবে, রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানী ছগীরা’। (হে আমার পালনকর্তা! তাদের দুজনের ওপর এরকম দয়া কর যেরকম তারা আমাকে ছোট বেলায় লালন পালন করেছিলেন) (-সুরা বনি ইসরাইল:২৩-২৪)

অন্যত্র আল্লাহপাক বলেন,‘আমি মানুষকে বিশেষ তাগিদ দিয়েছি তার পিতামাতার সাথে সদয় ব্যবহার করার। তার মা তাকে (গর্ভে) রেখেছে এবং তাকে দুধপান ছাড়ানোর সময় দিয়েছে ত্রিশ মাস। পরিশেষে যখন সে পূর্ণশক্তিতে পৌছে যায় এবং চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হয় তখন সে যেন বলে হে আমার পালনকর্তা আপনি আমাকে শক্তি দান করুন যাতে আমি আপনার সেই সম্পদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি যা আপনি আমাকে এবং আমার মাতাপিতাকে পুরষ্কার দিয়েছেন।

যাই হোক মাকে আমরা শুধু মা দিবসেই ভালবাসব না।
আমাদের কাছে মা দিবস হবে প্রতিদিন। বলাবাহুল্য ‘মা’ সে তো মা-ই। তাঁকে শুধু আজ কেন স্মরণ করবো?
সন্তানের জন্য যদি চিরদিন মমতা থাকে, তবে মা-বাবার জন্য ভালবাসা চিরদিন থাকবে। ভালবাসা উচিৎ সেই সব মানুষগুলোকে যারা প্রাকৃতিক অতিপ্রাকৃতিক সব ধরনের সমস্যা থেকে বুক আগলে সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখে। শুধু এতটুকু ভাবলেই আর কোন বিদ্ধাশ্রম হবে না। শেষের দিনগুলোতে অঝোরে কাঁদবে না সেই চোখ, যে চোখ দুটো সন্তানের মুখ দেখেই বলে দিতে পারত ছেলেটা আজ না খেয়ে ছিল।

মা শব্দটা যেন মনে এক অজানা স্বস্তি ও শান্তি নিয়ে আসে। এর চেয়ে মধুর শব্দ পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর দেশে-দেশে, মানুষে-মানুষে কিংবা ভাষা- সংস্কৃতিতে পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু মায়ের বেলায় অনুভূতির ক্ষেত্র এক। যেদিন দেশের সব বৃদ্ধাশ্রমে তালা ঝুলবে সেদিনই সার্থক হবে মা দিবস। মা’ দিবসে পৃথিবী’র সকল মা’ র প্রতি রইলো শ্রদ্বা ও ভালোবাসা।

রফিকুল ইসলাম মন্ডল বুলবুল
ভাইস চেয়ারম্যান, শ্রীপুর উপজেলা পরিষদ।