শুদ্ধতার প্রশ্নে সরকারের উচিৎ আগে বদিকে ক্রসফায়ারে দেওয়া : আবু রায়হান মিসবাহ

18

 

অবশেষে সরকারের টনক নড়েছে। মাদক যখন দেশটাকে গ্রাস করে ফেলেছে, প্রজন্ম যখন নষ্ট হওয়ার দাঁড়প্রান্তে, পাড়া মহল্লা মাদকের আখড়া হওয়ার পর সরকারের এই বোধোদয়। যার ধারাবাহিতায় বেশ কিছুদিন ধরে মাদকবিরোধী সাড়াঁশি অভিযান শুরু করেছে র‌্যাব। আর এই অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২২ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। এর মধ্যে ১ রাতেই মারা গেছে নয় জন।

র‌্যাব বা পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধের’ প্রতিটি বর্ণনা একই রকম। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে, ‘মাদক কারবারিতে’ সহযোগিতা, অমনি আক্রমণ এবং গোলাগুলি এক পর্যায়ে নিহত হয়েছে সন্দেহভাজন। সংবিধানবিরোধী এ ক্রসফায়ার হওয়ার পরেও সরকারকে সাধুবাদ জানাই। তবে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বলব, আসামিদেরকে ধরে আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করা হোক।

সাম্প্রতিক প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই নতুন করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অভিযান শুরু হয়েছে। এটা ভালো কথা। আমরা অবশ্যই চাই দেশ মাদকমুক্ত হোক, আমরা অবশ্যই চাই যারা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা এবং দেশ থেকে মাদককের মত মরণব্যাধি নির্মূল করা হোক।’ ‘কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করবে।’ আর হ্যাঁ যদি তা-ই করতে হয় তবে মাদক নির্মূলে সবার আগে বদির মত গডফাদারদের ক্রসফায়ারের আওতায় আনা হোক।

বলাবাহুল্য বর্তমান সরকার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের মাদক ব্যবসায়ীও গডফাদাররা বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। এদের সাথে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাকর্মীর নামও জড়িত। আর যাদের বিরুদ্ধে মাদকের কারবারি করার সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে এদের সবাইকে গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানাই। সরকার যদি সত্যিকার্থে মাদক নির্মূল করতে চায় সেক্ষেত্রে ‘সবার আগে নিজের ঘরের মাদক ব্যবসায়ীদেরকে গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ তা না করে সরকার যদি বদিদের ছেড়ে দিয়ে মাদক নির্মূলের চিন্তা করে সেটা তামাশার ছাড়া অন্যকিছু করি না।

এই তো কিছুদিন আগে কক্সবাজার জেলার টেকনাফের এমপি আবদুর রহমান বদি-কে জামিনে ছেড়ে দিয়েছে সরকার। সৌভাগ্যবান বদিও মহানন্দে আবারো পূর্বের ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে।’ অথচ বদির কারণে মানব পাচার, ইয়াবা ও রোহিঙ্গাদের বৈধকরণ—এই তিন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে টালমাটাল পর্যটন শহর কক্সবাজার। এর প্রভাব পড়ছে সারাদেশেও। সরকারের খাতায় এই তিন অপরাধেরই প্রধান পৃষ্ঠপোষক কক্সবাজার-৪ আসনের (উখিয়া-টেকনাফ) সাংসদ আবদুর রহমান বদি। সঙ্গে তাঁর ছয় ভাইসহ ২৬ জন কাছের ও দূরের আত্মীয়ও আছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা টেকনাফের শীর্ষ ৭৯ মানব পাচারকারীর তালিকায় সাংসদ বদির নাম আছে ১ নম্বরে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এ তালিকা করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে আরেকটি তদন্ত হয়। তাতে সাংসদের আট আত্মীয়কে মানব পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এর আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তালিকায়ও সাংসদ বদিকে মাদকের মূল পৃষ্ঠপোষক বলা হয়। ওই তালিকায় তাঁর ১৭ জন আত্মীয়ের নাম আছে।
আর রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে সহায়তাকারীদের তালিকায়ও আছে ১ নম্বরে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২০১৩ সালের অক্টোবরে এ তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ঢাকার হিসাব অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর এলাকায় মানব পাচারের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে তিন হাজার কোটি টাকার মাদকের বাজারের অর্ধেকই দখল করে রেখেছে ইয়াবা। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশের একমাত্র রুট টেকনাফ।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে সহায়তা করা, কক্সবাজারে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং পরে তাদের নাগরিক সনদ দিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেতে সহযোগিতা করাও বড় টাকার বাণিজ্য। তবে টাকার অঙ্কে এর কোনো হিসাব গ্রহণযোগ্য কোনো সংস্থা থেকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও কক্সবাজারের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা জানান, মানব পাচার ও ইয়াবা চোরাচালান—দুটিতেই মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও রোহিঙ্গাদের একটি চক্র জড়িত বলে অভিযোগ আছে।

গত বছরের ১১ জুন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সীতা পাহাড়ের বিপরীতে বাংলাদেশের জলসীমায় মালয়েশিয়াগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রলারের যাত্রীদের সঙ্গে নাবিক ও পাচারকারীদের সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচজন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান, আহত হন অর্ধশতাধিক। পরবর্তী সময়ে কোস্টগার্ড ২৯৮ জনকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে সেন্ট মার্টিনে নিয়ে আসে। উদ্ধার করা এবং জড়িত ওই ব্যক্তিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের পেছনের মূল হোতাদের নামের একটি তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে তালিকা যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয় ৭৯ জনকে মানব পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। তাতে সাংসদ আবদুর রহমান বদির নাম ১ নম্বরে রাখা হয়। তাঁর ভাই মুজিবর রহমানের নাম তালিকায় ৩ নম্বরে আছে।
রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সরবরাহকারীদের তালিকায়ও সাংসদ ভাইয়ের সঙ্গে মুজিবর রহমানের নাম ৮ নম্বরে আছে। আর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকায় তাঁর নাম ৭ নম্বরে আছে। এই তালিকার ২ নম্বরে আছে সাংসদের আরেক ভাই আবদুর শুক্কুরের (৩৮) নাম। ওই তালিকার ৪ নম্বরে সাংসদের ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম (২৩), ৫ নম্বরে ফয়সাল রহমান (২০) ও ৮ নম্বরে মোহাম্মদ আলমের (৩৫) নাম রয়েছে। শফিকুল ও ফয়সালের বাড়ি থেকে গত বছরের ২০ ডিসেম্বর একজন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। ওই ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলাও করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে সাতজনকে মুখ্য পাচারকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এঁরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় মাদক পাচারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন এবং বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। টেকনাফের চৌধুরীপাড়ার ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকায় ১ নম্বরে থাকা সাংসদ আবদুর রহমানের নামের পাশে লেখা হয়েছে, সাংসদের ছত্রচ্ছায়ায় লোকজন ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত।
সাংসদের অন্যসব আত্মীয় মানব পাচারকারীদের তালিকায় আছে তাঁর বোন শামসুন্নাহারের ছেলে সায়েদুর রহমান নিপু (২৪), বোনের দেবর হামিদ হোসেন (৪০), চাচাশ্বশুর জহিরউদ্দিন এবং সাংসদের দুই বেয়াই আক্তার কামাল ও শাহেদ কামাল। এ ছাড়া পুলিশের প্রতিবেদনে এদের বাইরে মানব পাচারকারী ও হুন্ডি ব্যবসায়ী হিসেবে সাংসদের খালাতো ভাই মং মং সেন, বেয়াই মো. হারুন (৪৫), আক্তার কামাল (৩৫), সাইদ কামাল (৩০), হামিদ হোসেন, হাসু ওরফে শামীম, মফিজুর রহমান ও তালই জহিরউদ্দিনের নাম আছে।

দেখা গেছে এসকল মাদক বিক্রেতারা দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নেশার অতলে ডুবিয়ে রেখেছে পুরো দেশটাকে। বেকারত্বের অভিশাপের পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে তরুণরা মাদকাসক্ত হচ্ছে। কেউ কেউ অন্যের সংস্পর্শে গিয়ে এই মাদক গ্রহণ করছে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অভিভাবক মহল সন্তানকে শাসনে না রাখতে পেরে দ্বারস্থ হচ্ছে আইনের। মাদকদ্রব্য বেচাকেনা রোধকল্পে প্রশাসনসহ কোনো মহলেরই প্রতিকারের তেমন উদ্যোগ নেই। মাদক বিক্রেতাদের অধিকাংশই জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে নতুন লোক নিয়োগ করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে শুধু শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, সমাজেও এর ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। মাদক গ্রহণের ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি বদহজম, চরম অবসাদ, আত্মহত্যার প্রবণতা, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, অসংলগ্ন ব্যবহার, দুর্বলচিত্ততা এবং হতাশা ইত্যাদি মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়। এ সামাজিক ব্যাধি থেকে তরুণ সমাজকে যে কোনো মূল্যে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এক্ষেত্রে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারিভাবে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে জোর প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে মাদকের কুফল সম্পর্কে জনগণ সচেতন হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য। সমাজের প্রত্যেক ব্যাক্তিকে মাদকের কুফল সম্পর্কে অবশ্য সচেতন হতে হবে। একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে সমন্বিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে আসতে হবে। এসব অপরাধ প্রবণতার পেছনে নানাবিধ কারণ বিরাজ করছে। তবে সব ধরনের অপরাধের কারণের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয়, ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি, প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা এবং প্রয়োগহীনতা অন্যতম। বিদ্যমান আইনের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীকে মানসিক দিক থেকে সংশোধনের প্রচেষ্টা চালানো উচিত। যাতে এ অপরাধ থেকে মুক্ত হয়ে সে বুঝতে পারে ইতোপূর্বে সে যা করেছে তা ব্যাক্তি, সমাজ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর। তাহলেই অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে। দন্ডবিধিতে অপরাধীর শাস্তির বিধান থাকলেও অপরাধীকে মানবিক দিক থেকে সংশোধনের কোনো বিধান নেই। বর্তমান দন্ডবিধি সংশোধন হওয়া আবশ্যক।

অন্যদিকে সরকারকে এটাও মনে করিয়ে দিতে চাই, এরকম বদি ‘একজন দুইজন নয়, এরা সংখ্যায় অসংখ্য। সরকার যদিও বা মুখে মাদক নির্মূলের কথা বলছে, প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে কতটা আন্তরিক সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া উপায় নাই।’ এছাড়া সরকারকে এটাও প্রমাণ করতে হবে ‘গত কয়েকদিন ধরে ছয়টি জেলায় যাদেরকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে এরা সবাই মাদক ব্যবসায়ী। এমনটা যেনো না হয় ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে বিরোধী পক্ষকে চাপে ফেলার এটি সরকারের লোকদেখানো কৌশল মাত্র।’